পেকুয়া প্রতিনিধি:

পেকুয়া উপজেলায় ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর পণ্য বিতরণ কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উপজেলার অনুমোদিত দুই টিসিবি ডিলারের একজন দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অনুপস্থিত, অন্যজন আবার কাগজে-কলমে দোকান ও গুদামের ঠিকানা দেখালেও বাস্তবে স্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্র ছাড়াই বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে পণ্য বিতরণ করছেন। এতে উপজেলার সাড়ে ৬ হাজারের বেশি ফ্যামিলি কার্ডধারী চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, পেকুয়া উপজেলায় টিসিবির অনুমোদিত দুই ডিলার হলো জেবি ট্রেডিং ও ইসলাম ট্রেডিং।

জেবি ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী প্রিয়তোষ নাথ। তার স্থায়ী বাড়ি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বটতলী এলাকায়। ডিলারশিপ সংক্রান্ত কাগজপত্রে বারবাকিয়া বাজারে তার দোকান ও গুদামের ঠিকানা উল্লেখ থাকলেও সরেজমিনে সেখানে কোনো স্থায়ী দোকান কিংবা গুদামের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে ইসলাম ট্রেডিংয়ের মালিক মনিরুল ইসলাম। তার বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলায়। পেকুয়া বাজারের ব্যবসায়ী পরিচয়ে তিনি ডিলারশিপ গ্রহণ করেন। কাগজপত্রে পেকুয়া আলহাজ্ব কবির আহমদ চৌধুরী বাজারে দোকান ও গুদামের ঠিকানা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সেখানে কোনো স্থায়ী দোকান বা গুদাম নেই বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে টিসিবির পণ্য বিতরণ হলেও দুই ডিলারের কেউই নিয়ম অনুযায়ী স্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্র ও গুদাম পরিচালনা করছেন না। একেক সময় একেক দোকান বা অস্থায়ী স্থানে পণ্য বিতরণ করায় কার্ডধারীরা বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েন। কোথায় কখন পণ্য বিতরণ হবে, তা জানতে গিয়ে অনেককে দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ইসলাম ট্রেডিংয়ের মালিক মনিরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে পেকুয়ায় অবস্থান করেন না। এমনকি তার নামে বর্তমানে টিসিবির বরাদ্দ হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও তিনি অবগত নন।

সম্প্রতি পেকুয়া সদর ইউনিয়নের প্রকাশিত ডেলিভারি অর্ডার (ডিও) অনুযায়ী জেবি ট্রেডিংয়ের নামে ১ হাজার ১৬টি এবং ইসলাম ট্রেডিংয়ের নামে ২৯৭টি ফ্যামিলি কার্ডের বিপরীতে পণ্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

তবে অভিযোগ রয়েছে, ইসলাম ট্রেডিংয়ের নামে বরাদ্দ হওয়া পণ্য কার্ডধারীরা পাননি। সারাদিন অপেক্ষা করেও অনেকেই খালি হাতে বাড়ি ফিরেছেন।

ইউনিয়ন পরিষদ সচিবদের তথ্য অনুযায়ী, পেকুয়া সদর ইউনিয়নে ১,৫০০, রাজাখালীতে ১,১০০, টৈটংয়ে ৯৩৬, বারবাকিয়ায় ৭৫০, মগনামায় ৮২১, উজানটিয়ায় ৮৫৪ এবং শিলখালীতে ৬৯৪টি টিসিবির ফ্যামিলি কার্ড রয়েছে। সব মিলিয়ে উপজেলায় মোট ৬ হাজার ৬৫৫টি কার্ডের বিপরীতে টিসিবির পণ্য বিতরণ হওয়ার কথা।

অভিযোগ রয়েছে, বরাদ্দকৃত সব কার্ডে নিয়মিত পণ্য বিতরণ না হওয়ায় অনেক উপকারভোগী তাদের প্রাপ্য খাদ্যসামগ্রী থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

স্থানীয় কার্ডধারীরা জানান, বর্তমানে এক ডিলার পণ্য বিতরণ করা হলেও এখন কখনও বাজারের পশ্চিম পাশে, আবার কখনও পূর্ব পাশে যেতে বলা হয়। নির্দিষ্ট বিক্রয়কেন্দ্র না থাকায় নারী, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন।

কার্ডধারী নাসির বলেন, সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। বিকেলে এসে বলা হলো আমার কার্ড অন্য ডিলারের কাছে। পরে সেই ডিলারকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। সারাদিন অপেক্ষা করে খালি হাতে বাড়ি ফিরেছি।

ইসলাম ট্রেডিংয়ের মালিক মনিরুল ইসলাম বলেন,আমি ডিলারশিপ নিলেও কখনো নিজে পণ্য বিতরণ করিনি। আমার কোনো দোকান বা গুদামও নেই। স্থানীয় সোহাগ ও অপর ডিলার প্রিয়তোষ আমার নামে পণ্য বিতরণ করতেন। মাঝে মধ্যে কিছু খরচ পাঠাতেন। গত পাঁচ-ছয় মাস ধরে এ বিষয়ে কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগও করেনি। আমার নামে এখনও বরাদ্দ হচ্ছে—এ বিষয়েও আমি কিছু জানি না।

তিনি অভিযোগের সুরে বলেন, জেবি ট্রেডিং এর প্রভাব আর অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করায় আমার ডিলার এলোমেলো হয়ে গেছে ।

জেবি ট্রেডিংয়ের মালিক প্রিয়তোষ নাথ বলেন, আমি শুধু আমার প্রতিষ্ঠানের বরাদ্দকৃত পণ্য বিতরণ করি। ইসলাম ট্রেডিংয়ের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।

টিসিবির নীতিমালা অনুযায়ী, অনুমোদিত বিক্রয়কেন্দ্র বা নির্ধারিত স্থানে অবস্থান করে পণ্য বিক্রি করতে হবে। বিক্রয়স্থলে মূল্যতালিকা, পণ্যের পরিমাণ ও প্রয়োজনীয় তথ্য দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শন বাধ্যতামূলক। এছাড়া নিজস্ব গুদাম বা অনুমোদিত সংরক্ষণস্থলে পণ্য রাখতে হবে এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া বিক্রয়কেন্দ্র পরিবর্তন করা যাবে না।

কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পেকুয়ার দুই ডিলারের ক্ষেত্রে এসব শর্তের একাধিকটি মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্ধারিত বিক্রয়কেন্দ্রের পরিবর্তে বিভিন্ন স্থানে পণ্য বিতরণ, স্থায়ী দোকান ও গুদামের অনুপস্থিতি এবং তদারকির অভাব নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। কার্ডধারীদের অভিযোগ, অনেক সময় পণ্য কম দেওয়া, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করানোসহ নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, সরকারি নীতিমালায় স্থায়ী দোকান ও গুদামের বাধ্যবাধকতা থাকলেও কীভাবে বছরের পর বছর তা ছাড়াই ডিলারশিপ পরিচালিত হচ্ছে? একজন ডিলার নিজেই যদি স্বীকার করেন যে তিনি কখনো পণ্য বিতরণ করেননি এবং তার কোনো দোকান বা গুদামও নেই, তাহলে তার নামে বরাদ্দ হওয়া টিসিবির পণ্য কে গ্রহণ করছে এবং কারা বিতরণ করছে?

এছাড়া প্রকৃত উপকারভোগীরা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কি না, ডিলারশিপ পরিচালনায় কোনো অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলা রয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট তদারকি কর্মকর্তারা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন কি না এসব বিষয় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।